রাজাকারদের ফাঁসি দিয়েছি, এবার তোদেরও ছাড়ব না’

প্রকাশিত: ৩:০২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৫

২০২৫ সালের ১১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চানখারপুল গণহত্যা মামলার শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এই আলাপের লিখিত রূপ পাঠ করেন। 

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই, কোটা সংস্কারবিরোধী আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্য, মল চত্বর ও আশপাশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সমবেত হয়। আন্দোলনের ঢেউ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে।

ঠিক সেই রাতেই ঘটে এক ফোনালাপ—তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে। 

পূর্ণ ফোনালাপ (লিখিত রূপ)

মাকসুদ কামাল: প্রত্যেক হল থেকে তো ছেলেমেয়েরা তালা ভেঙে বের হয়ে গেছে। এখন তারা রাজু ভাস্কর্যে, চার–পাঁচ হাজার ছেলেমেয়ে জমা হইছে। মল চত্বরে জমা হয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে আমার বাসাও আক্রমণ করতে পারে।

শেখ হাসিনা: তোমার বাসা প্রটেকশনের কথা বলে দিছি।

মাকসুদ কামাল: জি জি।

শেখ হাসিনা: আগে একবার করছে…।

মাকসুদ কামাল: ওই রকম একটা প্রস্তুতি…লাঠিসোঁটা নিয়ে বের হইছে।

শেখ হাসিনা: লাঠিসোঁটা নিয়ে বের হলে হবে না, আমি পুলিশ এবং বিডিআর হয়ে বিজিবি আর…বলছি খুব অ্যালার্ট থাকতে এবং তারা রাজাকার হইতে চাইছে তো, তাদের সবাই রাজাকার। কী আশ্চর্য কোন দেশে বসবাস করি।

মাকসুদ কামাল: জি জি…বলতেছে আমরা সবাই রাজাকার।

শেখ হাসিনা: তো রাজাকারের তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি। এই এত দিন ধরে আমরা কিন্তু বলিনি, ধৈর্য ধরছি, তারা আবার বাড়ছে।

মাকসুদ কামাল: বেশি বেড়ে গেছে এবং অতিরিক্ত বেড়ে গেছে…। আপা, একটু ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাটা আরেকটু বাড়ানো…আর আমার বাসার ওইখানেও…।

শেখ হাসিনা: ক্যাম্পাসের ব্যবস্থা করছি, সমস্ত ক্যাম্পাসে বিজিবি, র‍্যাব এবং পুলিশ—সব রকম ব্যবস্থা হইছে। তোমার বাসার ভেতরে লোক রাখতে বলছি। ভেতরে কিছু রাখা আছে…এত বাড়াবাড়ি ভালো না।

মাকসুদ কামাল: বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের ছেলেদেরকে মেরেছে। আরও দু–একটা হলে একই কাজ করেছে। ছাত্রলীগের ছেলেপেলে সাদ্দাম, ইনান, শয়ন—ওরা আমার বাসায় ছিল সন্ধ্যা থেকে। আমি খবর পাচ্ছিলাম, ওদেরকে আমি ডেকে নিয়ে আসছি, ওরাও আসছে। ওদের সাথে বসে ওদের হলে হলে যেন ছাত্রলীগকে সংঘবদ্ধ রাখে এবং ঢাকা উত্তর, দক্ষিণকে খবর দেয়। এগুলা করতে করতেই হাজার হাজার ছেলেমেয়ে একত্র হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা: কোন দেশে বাস করি আমরা। এদেরকে বাড়তে বাড়তে তো…রাজাকারদের কী অবস্থা হয়েছে দেখিস নাই, সবগুলাকে ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও ছাড়ব না।

মাকসুদ কামাল: হ্যাঁ, এবার এই ঝামেলাটা যাক, এরপরে আমিও নিজে ধরে ধরে যারা এই অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, মেইন যারা আছে, এদের বহিষ্কার করব ইউনিভার্সিটি থেকে।

শেখ হাসিনা: সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে। আমি বলে দিচ্ছি, আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে। কারণ ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামল, কতগুলি মেরে ফেলায় দিল না?

মাকসুদ কামাল: জি জি জি।

শেখ হাসিনা: ওই অ্যাকশন না নেওয়া ছাড়া উপায় নাই। আমরা এত বেশি সহনশীলতা দেখাই আজ এত দূর পর্যন্ত আসছে।

মাকসুদ কামাল: আমরা সহনশীলতা…আমি ছাত্রলীগকে বলছি যে তোমরা কোনো ধরনের ইয়ে করতে যাইও না। যেহেতু আদালতের বিষয়, আদালত নিষ্পত্তি করবে।

শেখ হাসিনা: না, এ আদালত হবে না, আবার ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিছে।

মাকসুদ কামাল: আবার রাষ্ট্রপতিকে কেউ এই রকম বলে যে ২৪ ঘণ্টার রাষ্ট্রপতিকে কেউ আলটিমেটাম দেয় একটা দেশে।

শেখ হাসিনা: রাষ্ট্রপতিকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিচ্ছে…বেয়াদবির একটা সীমা থাকে…!

মাকসুদ কামাল: আপা, আমি আপনাকে যদি অন্য কোনো খারাপের দিকে যায়, আমি আবার একটু জানাব। কিন্তু রাতের বেলা জানাব না, হয়তোবা আধা ঘণ্টা এক ঘণ্টার মধ্যে হলে জানাব।

শেখ হাসিনা: কোনো অসুবিধা নাই…আমি সব সময়ই ফ্রি।

মাকসুদ কামাল: জি জি, স্লামুআলাইকুম।

ট্রাইব্যুনালে প্রতিক্রিয়া

চিফ প্রসিকিউটর এই আলাপকে আন্দোলন দমন ও সহিংস কৌশলের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এই উপস্থাপনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা একে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণআন্দোলনে হুমকি হিসেবে দেখছে, আর সমর্থকরা বলছে, এটি ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ